ভারত ভ্রমণ

Jyoti Bikash Barua
(জ্যোতি বিকাশ বড়ুয়া)
লী ইয়ুং-সি রচিত
হিউয়েন সাঙের জীবনী
জ্যোতি বিকাশ বড়ুয়া
ভূমিকা
ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা আছে।সুইজ ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ
দ্য স্যুসুর শ্রেণী কক্ষে বক্তৃতা দিয়েছিলেন,সে বক্তৃতার নোট বা টোকা
রেখেছিলেন তাঁর দুই ছাত্র।
এই ভাষাবিজ্ঞানীর মৃত্যুর পর,তাঁর বক্তৃতার তাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে
তাঁরা গুরুর চিন্তাধারাকে সুশৃঙ্খল আকারে প্রকাশ করেন।ফলে আমরা ফার্দিনান্দ
দ্য স্যুসুরের সেই বহু বিখ্যাত গ্রন্থ পাই,যেখানে তিনি ভাষার লঙ ও প্যারোল
ও সিনক্রোনিক ও ডায়ক্রোনিক বিভাজন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন।আধুনিক
ভাষাতত্ত্বের এই স্রষ্টার সৃষ্টি রক্ষিত হয়েছিল উপযুক্ত শিষ্যের স্মৃতিতে
আর শ্রেণীকর্মে।এই ঘটনার মতো ঘটনা আরো একজনের ক্ষেত্রে ঘটেছিল,সেটা
প্রাচীনকালে বৌদ্ধযুগে।
বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউ এন সাঙ এই উপমহাদেশে এসেছিলেন।বাংলাদেশেও
এসেছিলেন। তাঁর নামটি ‘হিষুসানু-ৎ সাঙ’ লিখলে বোধ হয় মূল নামের নিকটবর্তী
হয়।তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন কেউ কেউ বলেন ৬০০ খ্রীস্টাব্দে;দু’এক বছর
আগে-পরেও পারে, তবে মনে রাখার সুবিধার জন্য ৬০০ খ্রীস্টাব্দ ধরে নিলে
সুবিধা হয়।জন্মগ্রহণ করেছিলেন চীনের চানগান শহরে।শৈশবে তিনি বৌদ্ধধর্মে
দীক্ষা গ্রহণ করেন।বৌ্দ্ধধর্মে যাঁর দীক্ষা,তাঁর মনে বৌদ্ধভূমি দেখার
আকাঙ্খা থাকবে তা স্বাভাবিক।প্রাচীনকালের তীর্থযাত্রার সূচনা সম্ভবত এরকম
আকাঙ্খা থেকেই সূচিত হয়েছিল।গৌতম বুদ্ধের জন্মের ঘটনা,জন্মস্থান দেখার
ইচ্ছা,তিনি যেসব পুণ্যস্থানে ধর্মপ্রচার করেছিলেন সেসব ঐতিহাসিক স্থান ও
কিংবদান্তিক জনপদ পরিভ্রমণ করেছিলেন,সেগুলো স্বচক্ষে দেখার ইচ্ছা লালন
করেছিলেন এই বিশ্ববিখ্যাত পরিব্রাজক।
গৌতম বুদ্ধ দারাপুত্র ত্যাগ করে, রাজকীয় ঐশ্বর্য বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার
অহংকার ত্যাগ করে এক গভীর রাতে গৃহত্যাগ করেন। গভীর এক দার্শনিক প্রশ্ন
তাঁর মনে।সংস্কৃতে কথা আছে মানব জীবনে সুখ-দুঃখ চক্রবৎ পরিবর্তিত হয়।সুখের
পর দুঃখ আসে,দুঃখের পর সুখ আসে।গৌতম বুদ্ধ রাজ্য পরিভ্রমণকালে জরা,বার্ধক্য
ও মৃত্যুর মতো শোকাবহ ঘটনা অবলোকন করে বিমর্ষ হয়ে পড়েন।দুঃখের উৎপত্তির
কারণ,দুঃখের স্বরুপ,জন্মচক্র অতিক্রম করে মোক্ষলাভের উপায় কী তা নিয়ে গভীর
চিন্তায় নিমগ্ন হন।‘ধর্ম,অর্থ,কাম,মোক্ষ’এই চতুর্বিধ বৈদিক প্রত্যয় তাঁকে
ভাবিত করে।তিনি বোধিবৃক্ষতলে ধ্যানমগ্ন হয়ে সিদ্ধিলাভের চেষ্টা করেন।দীর্ঘ
তপস্যার অবসানে তিনি জন্মের তাৎপর্য নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। ‘জন্মচক্রই
দুঃখের কারণ’- এই সত্য তিনি উপলব্ধি করেন। জন্ম-জন্মান্তরের গ্রন্থি ছিন্ন
করতে হলে সৎকর্ম, সৎচিন্তা, সৎবাক্য এমনি অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুধাবন করতে
হবে। গৌতম বুদ্ধ নিজ চিন্তা লোকজ ভাষায় জনপদে, জনপথে, হাটে মাঠে ঘাটে
প্রচার করা শুরু করলেন। এসব কর্মকান্ডের কোন ইতিহাস ছিল না। গৌতম বুদ্ধের
কাল অতিক্রম করে প্রায় ৩০০ বছরপর সম্রাট অশোক বুদ্ধ-বাণীকে রাজ্য পরিচালনার
জন্য ধর্মনীতি হিসাবে নির্ধারণ করে দেন। এই সময় গৌতম বুদ্ধের জীবন,কর্ম ও
বাণীর তাৎপর্য মানবজাতির জন্য ধারণ করে রাখার চেষ্টা করা হয়। বুদ্ধের বাণী
বৌদ্ধধর্মে রুপান্তরিত হয়। বিদেশ থেকে বৌদ্ধ অনুসারীরা উপমহাদেশে আসে,
উপমহাদেশ থেকে মানুষ অর্নদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে যান। এসব যাত্রা বর্তমান
যুগের পর্যটন ছিল না, ছিল ধর্মযাত্রা, ছিল তীর্থদর্শন।
লোক-পরম্পরায় লোকস্মৃতি নানাবিধ উপাখ্যানে রুপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
জাতকের গল্প বলে যেসব অসাধারণ নীতিকথার উপাখ্যানগুলো আমরা পাই তা এই সময়ের
সৃষ্টি বলে আমার মনে হয়। জাতকের গল্প ক্রমান্বয়ে বৌদ্ধভূমি ছাপিয়ে,
উপমাহাদেশ ছাপিয়ে, হিতোপদেশের মতো হয়ে বিশ্বের অসংখ্য ভাষায় প্রসারিত হয়।
ভারত উপমহাদেশ হয়ে পড়ে তখনকার পৃথিবীর প্রধান আকর্ষণ কেন্দ্র, যে আকর্ষণে
এখানে বিদেশী পরিব্রাজকেরা এসেছেন। মধ্য এশিয়া, পূর্ব এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া
সব অঞ্চল থেকে পূণ্যস্থান দেখার জন্য তপস্বীরা,বিদ্ধানেরা, সাধকেরা,
সন্ন্যাসীরা এ অঞ্চলে ভিড় জমায়। তাঁদের তীর্থযাত্রা সফল ও সহজতর করার জন্য
সামন্তপ্রভুরা, রাজারা, সম্রাটেরা ধর্মশালা স্থাপন করেন। বিহার সৃষ্টি
করেন, স্তূপ নির্মাণ করেন।
ভূমিদান করার প্রথা চালু হয়। নালন্দা, বিক্রমশীলা,সোমপুরী,জগদ্দল ও আরো
অসংখ্য জ্ঞানালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ জীবনকে ভালবাসতে শুরু করে। জীবন
দুঃখময় জেনেও আয়ুবৃদ্ধির সাধনায় নিরত হয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র ভারতবর্ষকে আরো
আকর্ষণীয় স্থান করে তোলে। শুধু মানুষের জন্য আয়ুর্বেদ নয়, হাতির মতো
প্রয়োজনীয় প্রাণীর জন্যও আয়ুর্বেদ উদ্ভাবিত হয়, যাকে বলা হয় হস্তায়ুর্বেদ।
ক্রমে মানুষ, হাতি, কুকুর, বানর, অশ্ব ইত্যাকার প্রাণীকে ভালবাসতে থাকে।
হরিণের মতো চঞ্চল প্রাণীও মানুষের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করে। হরিণ পার্ক বা
ডিয়ার পার্ক এখন অনেক দেশে
আছে। ‘প্রাণী হত্যায় বিরত থাকো’ ও ‘সর্বজীবে দয়া করো’-এর মতো মহৎ বাণী লোক
সচেতনতায় প্রবাহিত হওয়ার ফলে এসব প্রাণী মানুষের বশ্যতা স্বীকার করে। বশ
মানে, পোষ মানে। মানুষের মঙ্গলের জন্য জীবন উৎসর্গ করে। প্রাণী-জীবনের
মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষ। মানুষের দারিদ্র বৃদ্ধি পায় এই রকম
পরিবেশ তৎকালীন পৃথিবীর জন্য এক অতি আকর্ষণীয় পরিবেশ। দূরদূরান্তর থেকে
পরিব্রাজকেরা এ অঞ্চলে আসেন। দর্গম মরু কান্তার মেরু অতিক্রম করার অদম্য
আগ্রহ নিয়ে বহু মানুষ এ অঞ্চলে এসেছেন। সকলের কথা জানা নেই। যে কয়েকজনের
কথা জানা যায় তাঁদের মধ্যে চীনের চাঙআন থেকে আসা পরিব্রাজক হিউ এন সাঙের
নাম অগ্রগণ্য। তাঁর আগেও কেউ কেউ এসেছেন, কিন্তু তাদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত
তেমন বিশেষ পাওয়া যায় না। হিউ এন সাঙের জীবন বৃত্তান্ত ও ভ্রমণ বৃত্তান্ত
পাওয়া যায়, তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্য হুই-লি (Hui-Li)এবং ইয়েন ৎসিঙ Yen-tsing-
এর লেখা থেকে। সুতরাং হিউ এন সাঙের সাঙের বৃত্তান্ত তাঁর নিজের লেখা
বৃত্তান্ত নয়, তাঁর উপযুক্ত শিষ্যের গুরুভক্তির উৎকৃষ্ট নমুনা। এই
বৃত্তান্ত যে ঐতিহাসিক দিক থেকে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তা অল্পকথায় বলে শেষ করা
যাবে না। ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক শুরু হয়। তার আগে পর্যন্ত মানুষের প্রযুক্তিগত
ও কৃৎকৌশলের উন্নতির কথা চিন্তা করলে প্রাচীন পৃথিবীর এসব ভ্রমণ বৃত্তান্ত
পাঠ করে বিস্মিত হতে হয়। কোনোরকম প্রযুক্তির সহায়তা ব্যতীত যে কাজ তাঁরা
করেছেন তা আধুনিক মানুষের চিন্তার অগম্য। যাঁরা উপখ্যান পড়ে এ দুর্গম
অভিযাত্রার কাহিনী জানতে চান,তাঁদের জন্য সত্যেন সেন একাধিক উপন্যাস
লিখেছেন। ‘কুমার জীব’ এমন একটি উপখ্যান,‘আলবেরুনী’ উপন্যাসও প্রসঙ্গে
স্মরণীয়।
গৌতম বুদ্ধকে আশ্রয় করে, তাঁকে উপলক্ষ করে মানবজাতির চিন্তা-চেতনার ইতিহাসে
যে বিবর্তন ঘটেছে, মানবসভ্যতার ইতিহাসে তার তুলনা খুব বেশি পাওয়া যায় না।
তাঁর আগের কথা জানার উপায় নেই, কিন্তু তার পরে যীশুখ্রীষ্ট ও মোহাম্মদের
কথা মনে আসে।
হিউ এন সাঙ যখন পূর্বদেশ যাত্রা শুরু করেছিলেন, চাঙগান তখন চীন সাম্রাজ্যের
অংশবিশেষ। দীর্ঘ পরিকল্পনা, অনুমতি ও প্রস্তুতি নিয়ে ৬২৯ খ্রীস্টাব্দে
২৮/২৯ বছরের যুবক হিউ এন সাঙ, আধুনিক হোনান প্রদেশ থেকে যাত্রা শুরু করেন।
হিউ এন সাঙের পারিবারিক নাম ‘চেন’ (Chen) । জীবন-বৃত্তান্ত লেখক শিক্ষার্থী
দু’জন গুরুর বংশ পরিচয়, চারিত্রিক বৈশিষ্ট এবং আবয়ব -সৌষম্যের বর্ণনা
দিয়েছেন। হুইলি ও ইয়ে ৎসিঙ বিস্তারিতভাবে পরিচয় দিয়েছেন। এঁদের দু’জনের
রচিত The Life of Hsuan-Tsang গ্রন্থটি একাধিকবার অনূদিত হয়েছে,অংশবিশেষ।
১৯৫৮ সালে কিপিও থেকে এটি সম্পূর্ণ অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়।কেউ কেউ বলেন
হিউ এন সাঙের ভ্রমণ বৃত্তান্ত জানতে হলে এই বইটি অত্যন্ত সহায়ক বই হিসাবে
বিবেচিত হবে। বইটি এক সময়ে দুর্লভ চিল। চীনদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এরই
পুনরানুবাদ হয়।
জ্যোতি বিকাশ বড়ুয়া বাংলাদেশের একজন প্রাতিভাবান প্রকৌশল বিজ্ঞানী। বৌদ্ধ
ঐতিহ্যে মানুষ হওয়া এই প্রতিভাবান ব্যক্তি স্ব-উদ্যোগে, বাঙালী পাঠকদের
কাছে হিউ এন সাঙের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত উপস্থাপন করার ব্রত নিয়ে পরিব্রাজক হিউ
এন সাঙের ভারত ভ্রমন শীর্ষক এই গ্রন্থটি রচনা করেছেন। এটি আক্ষরিক অনুবাদ
নয়, পূর্ণাঙ্গ অনুবাদও নয়। তবে হিউ এন সাঙের জীবনের গুরুত্ববহ সব তথ্যই
এখানে সঞ্চিত হয়েছে। চীনা থেকে ইংরেজীতে অনূদিত রচনার সার সংকলন করে তিনি
বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে হিউ এন সাঙের জীবনের বিচিত্র কথা তুলে
ধরেছেন।জ্যোতি বিকাশ বড়ুয়ার ভাষা প্রাঞ্জল, তথ্য নিষ্ঠা গুরুত্ববহ এবং
আন্তরিকতা প্রশ্নাতীত। বঙ্গদেশ তথা এশিয়ার বৌদ্ধ সভ্যতার ধূসর একটি
অধ্যায়কে তিনি লোক সমক্ষে হাজির করে একটি মহৎ কর্ম সম্পাদন করেছেন। বাঙালীর
গৌরবের ঐতিহ্য লোকমানসকে সমৃদ্ধ করুক এই কামনা করি।
‘বিশ্বের সকল প্রাণী সুখী হোক’- এর চেয়ে বড় কামনা আজকের দিনে আর কি হতে
পারে!আমি তাই কামনা করছি।
মনসুর মুসা
সাবেক মহাপরিচালক, বাংলা অ্যাকাডেমি
গ্রন্থকারের নিবেদন
চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ ভারতে আসতে ও স্বদেশ চীনে ফিরে যেতে,উত্তর ও
দক্ষিণ রেশম পথ ধরে বর্তমান কাজাকস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকস্তান,
আফগাস্তিন ও পাকিস্তানের উপর দিয়ে বিশ্বের তিনটি সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণী
অতিক্রম করে সুদীর্ঘ ১০,০০০ মাইল পথ পাড়ি দেন। সে সময় চীনের ত্যাং
ডাইনেস্টি পূর্ব-চীনে তাঁদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে ব্যস্ত ছিল ।
উত্তর রেশম পথ ধরে আফগানিস্তান ও ভারতে যাবার সময় তিনি হামি, তুরফান,
খরসহর, কুচা ও আকসুতে বিশ্রাম নেন। এসব বিশ্রামেরস্থলে তিনি রাজাদের
সাক্ষাৎ লাভ করেন। পথে সহযাত্রী বণিক, যোদ্ধা ও ভিক্ষুদের মধ্যে বুদ্ধের
বাণী প্রচার করেন।
৬২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি যখনচীন থেকে ভারতে আসার অনুমতি প্রার্থনা করেন, তখন
চীনের ত্যাং সাম্রাজ্যের সাথে পূর্ব-তুর্কদের যুদ্ধ চলছিল। সে কারণে সম্রাট
তাঁর দেশ থেকে কারো বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন। হিউয়েন সাঙ কিংহাই ও লিয়াংজো
হয়ে যুমেনের প্রবেশদ্বারগুলির পাহারায় নিযুক্ত কর্মচারীদের বশীভূত করে চীন
সাম্রাজ্য থেকে বের হয়ে পড়েন। তারপর গোবি মরুভূমি পশ্চিমে তিয়ান সান হয়ে
৬৩০ খ্রিস্টাব্দে তুরফানে পৌঁছেন। তুরফানের বৌদ্ধ-রাজা তাঁকে প্রয়োজনীয়
পাথেয় ও পথের অন্যান্য রাজাদের কাছে পরিচয় পত্র দেন। পরে আরো পশ্চিমে গমন
করে ইয়ানকি ও কুচে পৌছান। আরো পশ্চিমে এগিয়ে প্রথমে আকসু, পরে ইস্সিক কুল’-এর পাশ দিয়ে
টোকমাকে পৌঁছেন। সেখানে ‘গ্রেট খান’-এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। সে সময় ত্যাং
সম্রাটের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল । তারপর তিনি পশ্চিমে ও দক্ষিন-পশ্চিমে
গমন করে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে পৌঁছেন। এরপর আরেকটি মরুভূমি
অতিক্রম করে সমরখন্দে পৌঁছেন। আবার দক্ষিণে যাত্রা করে পামির মালভূমির
ছাড়িয়ে বিখ্যাত তুর্কি ‘লৌহ দরওয়াজা’ অতিক্রম করেন। এভাবে আরো দক্ষিণে
অগ্রসর হয়ে আমু দরিয়া ও তেরমেজে পৌঁছেন। তারপর পূর্বদিকে গমন করে কুন্দুজ
পৌঁছেন। কুন্দুজে শাহজাদা তারদুরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য
সেখানে কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখান থেকে বিখ্যাত বৌদ্ধ স্থান ও স্মারক,
বিশেষ করে নওবিহার দর্শনের জন্য আফগানিস্তানের বলখ্- এ যান। সেখানে ৩,০০০
ভিক্ষুর দেখা পান। ভিক্ষু প্রজ্ঞাকারের সাথে কিছু আদি বৌদ্ধ শাস্ত্র পাঠ
করেন। তারপর বামিয়ানে গিয়ে বিখ্যাত বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি দেখেন। তারপর তিনি
শিবির পাস হয়ে কপিশায় (বর্তমান কাবুল থেকে ৬০ মাইল উত্তরে)পোঁছেন। তারপর
জালালাবাদ ও লাগমান-এ ।সেখানে পৌঁছে তিনি মনে করেন, ভারতবর্ষে পোঁছে
গেছেন। তিনি জালালাবাদে বেশ কিছু ভিক্ষু, বহু বিহার ও স্তূপ দেখেন। তারপর
তিনি হুনজ ও খাইবার পাস অতিক্রম করে গান্ধারের রাজধানী পুরুশপুরে (বর্তমান
পেশোয়ার) পৌঁছেন। পুরুশপুরে তিনি বৌদ্ধধর্মের অবনতি লক্ষ্য করেন।
পুরুশপুরের দক্ষিণ-পূর্বে ছিল কণিষ্কের বিশাল স্তূপ। পরবর্তিকালে হিউয়েন
সাঙের বর্ণনার সূত্র ধরে ১৯০৮ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ ডি বি স্পুনার এটা
আবিষ্কার করেন।
তারপর বিউয়েন সাঙ উদ্দিয়ান রাজ্য (সোয়াত উপত্যকা ও বুনার উপত্যকা) ভ্রমণ
করেন। তারপর সিন্ধু অতিক্রম করে তক্ষশীলায় পৌঁছেন। তখন তক্ষশীলা ছিল
কাশ্মীরের আশ্রিত রাজ্য। সেখান থেকে তিনি কাশ্মীরে যান। কাশ্মীরে তিনি ১০০
বিহার ও ৫,০০০ ভিক্ষু দেখেন। মহাযান শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ পন্ডিতের কাছে
শিক্ষার জন্য তিনি সেখানে দু’বছর অবস্থান করেন। ৬৩৩ সালে তিনি কাশ্মীর
ত্যাগ করে দক্ষিণে গমন করে চিনাভুক্তিতে (বর্তমান ফিরোজপুর) আসেন এবং
ভিক্ষু বিনিতপ্রভ’র কাছে এক বছর অধ্যয়ন করেন।
৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে আসেন জলন্ধরে। অতঃপর কুলু উপত্যকার বিহারগুলি দর্শন করেন।
আবার দক্ষিণে গমন করে বৈরাত হয়ে যমুনার তীরে মথুরায় পৌঁছেন। ৬৩৫ সালে গঙ্গা
পার হয়ে মাটিপুরায় পৌঁছেন। তারপর আবার দক্ষিণে গমন করে সংকাস্য পৌঁছেন,
যেখানে বুদ্ধ স্বর্গ থেকে নেমে এসছিলেন বলে কথিত আছে। সেখান থেকে তিনি
পৌঁছেন সম্রাট হর্ষর্বধনের রাজধানী কান্যকুব্জে। কান্যকুব্জ থেকে ফিরে
আসেন শ্রাবস্তীতে। সেখান থেকে তিনি যান কপিলাবস্ত্ত ও লুম্বিনীতে। লুম্বিনী
থেকে কুশীনগরে, তারপর সারানাথে। সারানাথ থেকে উত্তর-পূর্বে গমন করে বারানসী
হয়ে বৈশালী পৌঁছেন। বৈশালী থেকে আসেন বুদ্ধগয়ায়।
৬৩৭ সালে তিনি বুদ্ধগয়া থেকে নালন্দার ভিক্ষুদের সাথে আসেন বঙ্গদেশের
বিখ্যাত বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় নালন্দা মহাবিহারে। সেখানে তিনি আচার্য
শীলভদ্রের অধীনে দুই বছরকাল বিভিন্ন বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং ব্যাকরণ,
তর্কশাস্ত্র, সংস্কৃত ইত্যাদি অন্যান্য বিষয়েও শিক্ষালাভ করেন।
দু’বছর পরে নালন্দা থেকে বের হয়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বদিকে গমন করে তিনি
পুন্ড্রনগর, কর্ণসুবর্ণ ও সমতট রাজ্য ভ্রমণ করেন। তারপর তাম্রলিপ্তি হয়ে
অযোধ্যায় পৌঁছেন। তারপর আরো দক্ষিণদিকে অগ্রসর হয়ে যান অন্ধ্রপ্রদেশের
অমরাবতী ও নাগার্জুনকোন্ডায় দ্রাবিড়ের পহ্লব রাজাদের রাজধানী কাঞ্চীতে।
কাঞ্চী থেকে মহারাষ্ট্র অতিক্রম করে নর্মদা তীরে পৌঁছেন। পরবর্তীতে
উত্তর-পশ্চিমে গমন করে গুজরাটের বল্লভীতে পৌঁছেন। সেখানে উজ্জয়িনী ও বিদিশা
ঘুরে সিন্ধুতে উপনীত হন। সিন্ধু নদী পার হয়ে মুলতান হয়ে নালন্দার দিদকে
যাত্রা শুরু করেন। ৬৪২ সালে তিনি আবার নালন্দায় ফিরে আসেন।
তারপর কামরুপের রাজা কুমার ভাস্করবর্মণের আমন্ত্রণে প্রাচীন নগর
প্রাগজ্যোতিষপুরে (বর্তমান গৌহাটি)উপস্থিত হন। পরে সম্রাট হর্ষের আমন্ত্রণে
রাজা কুমারসহ কান্যকুব্জে পৌঁছান। কান্যকুব্জের ঐতিহাসিক বিতর্কসভায় অংশ
নেন। তারপর সম্রাটের সাথে প্রয়াগে তাঁর বিখ্যাত দান উপৎসবে যোগ দেন। এই
প্রয়াগ থেকেই ৬৪৩ সালে স্বদেশের উদ্দেশে রওনা দেন।
৬৪৫ সালের জানুয়ারীতে তিনি চীনের রাজধানী চাওআনে পৌঁছেন। হিন্দুকুশের
খাইবার পাস অতিক্রম করে কাশগড় খোটান ও দুনহংগ হয়ে চীনে প্রবেশ করেন। তিনি
দেশে ফিরে ১৯ বছর ধরে আমৃত্যু ভারত থেকে আনা বৌদ্ধশাস্ত্রের বিশাল
পুঁথি-পুস্তক সংগ্রহের অনুবাদ করে যান। তিনি ১৭ বছরের ঐতিহাসিক
ভ্রমণযাত্রার বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। এই বিবরণে আছে, তাঁর দুর্গম
অভিযাত্রার লোমহর্ষক কাহিনী, যে সকল স্থান তিনি ভ্রমণ করেছেন সে সব
স্থানের ভৌগলিক, প্রাকৃতিক ও ও রাজনৈতিক বিবরণ, জনগণের আচার আচরণের বিবরণ ও
বিশেষ বিশেষ স্থানের বিশদ বিবরণ। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত থেকে আমরা জানতে
পারি, সে যুগের কর্ণসুবর্ণ, পুন্ড্রনগর, সমতট ও তাম্রলিপ্তির কথা-সপ্তম
শতাব্দীর গৌড় বাংলার কথা।
বিশ্বমানের এই মহাপরিব্রাজকের ভ্রমণের একমাত্র তুলনা হতে পারে বতুর্দশ
শতকের ইবনে বতুতার ভ্রমণ। মহান অভিযাত্রী ছাড়াও তিনি ছিলেন একাধারে
বৌদ্ধশাস্ত্রের অসাধারণ পণ্ডিত, বহু ভাষাবিদ, দক্ষ অনুবাদক, শ্রেষ্ঠ
তার্কিক, বিজ্ঞ ঐতিহাসিক ও মস্তবড় দার্শনিক।
এই মহান পণ্ডিত পরিব্রাজকের জীবনী ও তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত চীনা ভাষায় বহু
পূর্বেই রচিত হয়েছে। অন্যান্য ভাষায় রচিত হয়েছে। তবে বহুদিন ফরাসি ও ইংরেজি
ভাষায় রচিত তাঁর জীবনী ছিল অসম্পূর্ণ। অবশেষে চীনা পণ্ডিত লী ইয়ুং-সি ১৯৫৯
সালে তাঁর জীবনীর পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অনুবাদ সম্পন্ন করেন। বাংলা ভাষায় তাঁর
কোনো জীবনী প্রকাশতি হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। তাই বাংলাভাষী অনুসন্ধিৎসু
পাঠকের জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। এর ভালমন্দের বিচার পাঠকের উপর ন্যস্ত
রইলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও বাংলা একাডেমীর
প্রাক্তন মহাপরিচালক ও অসাম্প্রদায়িক মুক্তবুদ্ধি চেতনার অগ্রপথিক অধ্যাপক
মনসুরা মুসা বইটির সারগর্ভ একটি ভূমিকা লিখে দিয়ে আমাকে আজীবন কৃতজ্ঞতা
পাশে আবদ্ধ করেছেন।
জ্যোতি বিকাশ বড়ুয়া
