বাঙ্গাল নামা

Tapan Roychowdhury (তপন রায় চৌধুরী )
(8 May 1926 - 26 November 2014)
বাঙ্গাল নামা
তপন রায়চৌধুরী
নিবেদন
২০০৬ সালের গোড়ার
দিকে ‘বাঙালনামা’ লেখা শেষ করি। ২০০৭-এর ১৭ এপ্রিল ‘দেশ’ পত্রিকায় লেখাটির
শেষ কিস্তি প্রকাশিত হওয়ার কথা। ‘বাঙালনামা’র শেষ পরিচ্ছেদে লিখেছি,-আমি
হৃদপিন্ডের একটি ‘ভাল্ব’ বদল করার জন্য অস্ত্রোপচারে সম্মতি দিয়েছি। সেই
অস্ত্রোপচার হবে ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল- ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘বাঙালনামা’র শেষ
কিস্তি ছাপা হওয়ার পরের দিন। এই যোগাযোগের পিছনে ভাগ্যদেবতার কোনও
প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে কি না জানি না।
‘দেশ’ পত্রিকার
গ্রাহক শুনি লক্ষাধিক। তা হলে পাঠকসংখ্যা তার অন্তত-তিন গুণ। এই বিরাট
সংখ্যার পাঠকমন্ডলীর কাছ থেকে যে প্রতিক্রিয়া পেয়েছি তা সত্যিই অপ্রত্যাশিত
এবং আমার কাছে কিছুটা দুর্বোধ্য। কারণ আমার জীবন সাদামাটা শিক্ষাজীবীর। তাই
রোমাঞ্চহীন এই জীবনকথা পাঠক-পাঠিকার কেন ভাল লাগল তার কোনও সদ্ব্যাখ্যা আমি
পাইনি।
পাঠকদের চিঠিতে
আমার অনেক ভুল দেখানো হয়েছে। সম্পূর্ণ স্মৃতিভিত্তিক রচনা,-এবং
অস্ত্রোপচারটি এক বছর আগে হওয়ার কথা ছিল, সেই কারণে একটু তাড়াতাড়িতে লেখা।
ফলে বেশ কিছু ভুল আছে। সেগুলি শোধরাতে যাঁরা সাহায্য করেছেন, তাঁদের প্রতি
আমি কৃতজ্ঞ। তবে বলি,-অনেক ক্ষেত্রে ভুল পত্রলেখকরাই করেছেন, আমি না। আর
কিছু পত্রলেখকের চিঠিতে এক বিচিত্র বিদ্বেষ-প্রণোদিত মনোভঙ্গির প্রকাশ
প্রকাশ দেখেছি। অনেকেরই আপত্তি- মুসলমানদের আমি যথোচিত গালিগালাজ করিনি।
এবং পত্রলেখকের গালিগালাজের লক্ষ্য সুশোভন সরকার এবং সুখময় চক্রবর্তী। এ
বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। চিঠিতে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত না
হওয়ায় শুনেছি লেখক অন্যত্র ওটি ছাপাবার ব্যবস্থা করেন। ওঁর উদ্যোগ যথোচিত
প্রশংসা করার ভাষা আমার নেই। আক্ষেপের কথা,-শিক্ষিত বাঙালির মধ্যে এ জাতীয়
ব্যক্তি অপ্রতুল না, ঔপনিবেসিক যুগের বহুব্যাপী ব্যর্থতাবোধ আমাদের জাতীয়
চরিত্রের অঙ্গ হয়ে গেছে। আমাদের ঈর্ষা-বিদ্বেষের ব্যাখ্যা সেইখানে খুঁজতে
হয়।
বহু মানুষের সাহায্য এবং উৎসাহ এই রচনা সম্ভব করেছে। তাঁদের মধ্যে অনেকে
‘দেশ’ পত্রিকা এবং ‘আনন্দ পাবলিশার্স’-এর কর্মী। এই দুই সংস্থা তাঁদের
কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না-জায়েজ ঘোষণা করেছেন। অতএব হৃদয়ের কথা
হৃদয়েই রইল। যাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারলাম না,-আশা করি তাঁরা
টেলিপ্যাথির সাহায্যে বুঝে নেবেন।
কয়েকটি মানুষকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ব্যাপারে আর একটু সোচ্চার হচ্ছি। তাঁদের
শীর্ষে প্রয়াত বন্ধু কুমার মুখার্জি এবং অমর সান্যাল। কুমার ‘রোমন্থন’
প্রকাশ হওয়া অবধি বর্তমান লেখাটি লিখতে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। দুই কিস্তি প্রকাশ
হওয়ার পর তিনি চলে গেলেন। আমার নানা অনুল্লেখ্য কাজের সাক্ষী অমর সান্যাল
মহা উৎসাহে লেখাটি পড়ছিলেন। যে কিস্তিতে ওঁর কথা লিখেছি, সেটি প্রকাশিত
হওয়ার কয়েকদিন আগে তিনিও লোকান্তরিত হলেন। আমার সমস্ত লেখাটি ধাপে ধাপে
যাঁদের মাথায় লোষ্ট্রবৎ নিক্ষেপ করেছি তাঁদের মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য
ঔপন্যাসিক-অধ্যাপক কুণাল বসু এবং তাঁর পত্নী সুস্মিতা। অক্সফোর্ডে ওঁদের
বহু শ্রান্ত সন্ধ্যা স্মিত মুখে এই অত্যাচার সহ্য করে কেটেছে। আমার স্ত্রীও
এই উৎপীড়নের সহ-শিকার ছিলেন। চতুর্থ এবং পঞ্চম যে দুই ব্যক্তি এইভাবে
উৎপীড়িত হয়েছেন দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁরাও ‘আনন্দবাজার’ সংস্থার কর্মী, ফলে
তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা তাঁদেরও টেলিপ্যাথি মারফত বুঝে নিতে হবে।
এই বইটি উৎসর্গিত লীলালক্ষ্মী বিঘ্নরাজা, তাঁর জন্মদাত্রী আমার কন্যা
সুকন্যা এবং তস্যা মাতা হাসিকে। আমার জীবনরস যখন শুকিয়ে আসছিল তখন
লীলালক্ষ্মীর আবির্ভাব। এখন আরও একশো বছর বাঁচতে ইচ্ছে করছে। শুনে লীলা
সন্দেহ প্রকাশ করলেন। বললেন “Dadu, you will be very old by that time”.
তারপর একটু চিন্তা করে,- `So shall I’।
| তপন রায়চৌধুরী |
